News

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ভ্যাট ২০২৬। NBR আদেশ ও হার

বাংলাদেশের ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাত দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রসারের সাথে সাথে কর ব্যবস্থাপনাও জটিল আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ভ্যাট ২০২৬ নিয়ে উদ্যোক্তাদের মনে নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি ছিল। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এই অস্পষ্টতা দূর করতে ২০২৬ সালের ৭ জুন ‘সাধারণ আদেশ নং-০৫/মুসক/২০২৬’ জারি করেছে। এই আর্টিকেলে আমরা সেই আদেশের আলোকে অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের ভ্যাট সংক্রান্ত বিষয়গুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করব।

Contents hide

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ে ভ্যাট কত?

অনলাইনে পণ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে ভ্যাটের হার পুরোপুরি নির্ভর করে আপনার ব্যবসার মডেলের ওপর। আসলে, আপনি কীভাবে পণ্য বিক্রি করছেন, সেটাই এখানে মুখ্য। একটু ভেবে দেখলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।

  • অনলাইন খুচরা বিক্রেতা (Retailers): আপনি যদি নিজে পণ্য কিনে এনে ক্রেতার কাছে বিক্রি করেন, তাহলে আপনার ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী পর্যায়ে ৭.৫% ভ্যাট প্রযোজ্য হবে।
  • মার্কেটপ্লেস (Marketplaces): দারাজ, চালডাল বা সাজগোজ-এর মতো প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রে তারা শুধু তাদের প্রাপ্ত কমিশন বা সার্ভিস চার্জের ওপর ১৫% ভ্যাট দেবে।
  • অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য: চাল, ডাল, কাঁচাবাজার বা শাকসবজি বিক্রিতে মূল পণ্যের ওপর কোনো ভ্যাট নেই। তবে মার্কেটপ্লেস এর মাধ্যমে বিক্রি করলে ওই সার্ভিসের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রযোজ্য হবে।
  • দ্বৈত-কর এড়ানো: মূল উৎপাদনকারী যদি আগে ভ্যাট পরিশোধ করে থাকেন, তাহলে খুচরা পর্যায়ে পুনরায় সম্পূর্ণ পণ্য মূল্যের ওপর মূসক দিতে হবে না। এই ব্যাপারটা অনেকেই জানেন না, যা বড় ধরনের ভুল হতে পারে।

নতুন NBR আদেশ ২০২৬ মূল বিষয়গুলো কী?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক জারিকৃত সাধারণ আদেশ নং-০৫/মুসক/২০২৬ মূলত মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর আগের নির্দেশনা রহিত করে ই-কমার্স খাতের জন্য একটি পরিষ্কার রূপরেখা দিয়েছে। সত্যি বলতে, এই আদেশের আগে পরিস্থিতি অনেকটা জটিল ছিল।

কেন এই আদেশের প্রয়োজন হলো?

আগে অনলাইন ব্যবসায়ীদের মধ্যে কে ভ্যাট দেবেন আর কীভাবে দেবেন তা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল। নতুন আদেশে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্পষ্টভাবে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে ট্যাক্স স্ট্রাকচার সাজানো হয়েছে:

  1. অনলাইন খুচরা বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান
  2. মার্কেটপ্লেস পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান
  3. মিশ্র প্রতিষ্ঠান (উভয় ধরনের কার্যক্রম পরিচালনাকারী)

অনলাইন খুচরা বিক্রেতা (F-Commerce/E-Commerce) ভ্যাট নিয়ম কী?

অনলাইন খুচরা বিক্রয়কারী বলতে বোঝায়, যারা বিভিন্ন উৎস থেকে পণ্য কিনে নিজস্ব ওয়েবসাইট বা ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেন।

  • ভ্যাটের হার: ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট হার ৭.৫% (মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ এর তৃতীয় তফসিলের অনুচ্ছেদ ৩ অনুযায়ী)।
  • কখন ১৫% ভ্যাট লাগবে? যদি উৎপাদনকারী বা সাপ্লায়ার পর্যায়ে ভ্যাট পরিশোধ না করা হয়, তবে বিক্রেতাকে ক্রেতার কাছ থেকে প্রাপ্ত মোট মূল্যের (পণ্য মূল্য + অনলাইন সার্ভিস চার্জ) ওপর ১৫% হারে ভ্যাট আদায় করতে হবে।
  • প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস: কর পরিশোধের আইনি প্রমাণ হিসেবে মুসক চালানপত্র বা ট্রেজারি চালানের কপি অবশ্যই সংরক্ষণ করতে হবে।

মার্কেটপ্লেস (Daraz, Chaldal, Foodpanda) ভ্যাট নিয়ম কী?

মার্কেটপ্লেস হলো এমন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেখানে অন্যান্য বিক্রেতারা পণ্য তালিকাভুক্ত করেন। মার্কেটপ্লেস নিজে কোনো পণ্য কেনে না, শুধু ক্রেতা ও বিক্রেতার মাঝে মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।

  • ভ্যাটের হার: মার্কেটপ্লেসকে তাদের প্রাপ্ত কমিশন বা সার্ভিস ফি-র ওপর ১৫% ভ্যাট দিতে হবে, পণ্যের মোট মূল্যের ওপর নয়।
  • চালানপত্র সংরক্ষণ: মার্কেটপ্লেস যেহেতু সরাসরি পণ্য বিক্রি করে না, তাই ট্রেজারি চালান রাখার বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। তবে কর কর্মকর্তার চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে ক্রেতা-বিক্রেতার লেনদেনের তথ্য দিতে তারা আইনত বাধ্য।

ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের জন্য ভ্যাট কমপ্লায়েন্স গাইড (ধাপে ধাপে)

আপনি যদি একজন উদ্যোক্তা হন, তাহলে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করে আপনার ব্যবসাকে কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারেন।

ধাপ ১: ব্যবসার ধরন নির্ধারণ করুন

আপনি কি নিজে পণ্য কিনে বিক্রি করেন (খুচরা বিক্রেতা), নাকি আপনার প্ল্যাটফর্মে অন্যরা বিক্রি করেন (মার্কেটপ্লেস)? এটি নিশ্চিত করুন।

ধাপ ২: ভ্যাট নিবন্ধন (BIN Registration)

বার্ষিক বিক্রয় ৮০ লাখ টাকার বেশি হলে ভ্যাট নিবন্ধন (VAT Registration) বাধ্যতামূলক। টার্নওভার ৩০ লাখ থেকে ৮০ লাখের মধ্যে হলে ৩% টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হয়। NBR-এর ভ্যাট অনলাইন সিস্টেমে (vat.gov.bd) সহজেই নিবন্ধন করা যায়।

ধাপ ৩: সঠিক ভ্যাট রেট নির্ধারণ

চালান দেখে নিশ্চিত হোন উৎপাদনকারী ভ্যাট দিয়েছেন কিনা। প্রযোজ্য হলে ৭.৫% বা ১৫% হারে ভ্যাট যোগ করুন।

ধাপ ৪: মাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিল

প্রতি মাসের ভ্যাট রিটার্ন (মুসক-৯.১ ফর্ম) পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে অনলাইনে দাখিল করতে হবে।

৫. কোন পণ্যগুলো অনলাইনে ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত?

প্রথম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত নিচের পণ্যগুলো ভ্যাট অব্যাহতিপ্রাপ্ত। তবে মনে রাখবেন, মার্কেটপ্লেস দিয়ে বিক্রি করলে প্ল্যাটফর্মের ‘সেবা মূল্য’ বা কমিশনের ওপর ঠিকই ১৫% ভ্যাট লাগবে:

  • শাকসবজি ও তরিতরকারি
  • মাছ (তাজা ও শুঁটকি)
  • চাল, গম ও ডাল জাতীয় পণ্য
  • গরু, ছাগল ও মুরগির মাংস
  • ডিম ও দুধ

একনজরে অনলাইন বিক্রয়ে ভ্যাট রেট (২০২৬)

প্রতিষ্ঠানের ধরনভ্যাটের হারকীসের ওপর প্রযোজ্য
অনলাইন খুচরা বিক্রেতা৭.৫%ব্যবসায়ী পর্যায়ে বিক্রয় মূল্য
মার্কেটপ্লেস১৫%কমিশন বা সার্ভিস ফি
ভ্যাট না দিলে১৫%ক্রেতার সম্পূর্ণ পরিশোধিত মূল্য
অব্যাহতিপ্রাপ্ত পণ্য বিক্রিতে১৫%শুধু সার্ভিস মূল্যে বা কমিশনে

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর

ফেসবুকে (F-commerce) পণ্য বিক্রি করলে কি ভ্যাট দিতে হয়?

হ্যাঁ। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা যেকোনো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পণ্য বিক্রয়ও ‘অনলাইন পণ্য বিক্রয়’ সেবার আওতাভুক্ত। বার্ষিক বিক্রয় নির্ধারিত সীমা পেরোলে ভ্যাট নিবন্ধন ও পরিশোধ করা বাধ্যতামূলক।

Daraz বা Chaldal-এ বিক্রি করলে বিক্রেতাকে কি আলাদা ভ্যাট দিতে হবে?

মার্কেটপ্লেস শুধু তাদের কমিশনের ওপর ১৫% ভ্যাট দেয়। কিন্তু বিক্রেতা যদি নিজে ভ্যাট নিবন্ধিত হন, তবে তার পণ্যের বিক্রয়ে প্রযোজ্য ভ্যাট তাকেই আলাদাভাবে দিতে হবে।

অনলাইনে খাবার বিক্রি করলে (Foodpanda, Shohoz) ভ্যাট কত?

রেস্তোরাঁগুলো সাধারণত ৫% ভ্যাট দেয়। তবে ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলো মার্কেটপ্লেস হিসেবে কাজ করায় তারা শুধু তাদের কমিশনের ওপর ১৫% ভ্যাট প্রদান করে।

ভ্যাট না দিলে কী শাস্তি হতে পারে?

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী নিবন্ধন না করলে বা ভ্যাট ফাঁকি দিলে অনাদায়ী কর, সুদ এবং জরিমানা প্রযোজ্য হবে।

অনলাইন ব্যবসায় ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (উপকরণ কর রেয়াত) পাওয়া যাবে?

আইনের ধারা ৪৬ অনুযায়ী, খুচরা পণ্য বিক্রয়ে উপকরণ কর রেয়াত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মার্কেটপ্লেসগুলোর (সেবা সরবরাহকারী) ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত প্রযোজ্য।

বিশ্বস্ত তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:

  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR): সাধারণ আদেশ নং-০৫/মুসক/২০২৬, তারিখ: ৭ জুন ২০২৬
  • মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ (আইন নং ৪৭/২০১২)
  • মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬
  • NBR প্রজ্ঞাপন এসআরও নং-১৮৬-আইন/২০১৯/৪৩-মুসক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!