News

মনসা পূজা ২০২৬ কত তারিখ? সঠিক দিন, তিথি ও পূজার নিয়ম

মনসা পূজা ২০২৬ কত তারিখ এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে প্রচলিত বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রীশ্রী মনসাদেবীর পূজা অনুষ্ঠিত হবে ১৮ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার। এটি ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি। এই দিনেই লুষ্ঠন ষষ্ঠী (লোটন ষষ্ঠী) পালিত হয় এবং বহু স্থানে মাসব্যাপী মনসা পূজার প্রধান আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী এই দিনে সূর্যোদয় হবে ভোর ৫:৪৬:১১ মিনিটে এবং সূর্যাস্ত হবে সন্ধ্যা ৬:৩৪:৫৯ মিনিটে। চন্দ্রোদয় হবে দিবা ১০:৪৯ মিনিটে এবং চন্দ্রাস্ত হবে রাত্রি ১০:০৬ মিনিটে। যারা ঘরোয়া বা মন্দিরে মনসা পূজার আয়োজন করতে চান, তাদের জন্য এই সময়সূচি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিষয়তথ্য
উৎসবশ্রীশ্রী মনসাদেবীর পূজা
ইংরেজি তারিখ১৮ আগস্ট ২০২৬
বারমঙ্গলবার
বাংলা তারিখ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩
পক্ষশুক্লপক্ষ
তিথিষষ্ঠী
সূর্যোদয়৫:৪৬:১১
সূর্যাস্ত৬:৩৪:৫৯
চন্দ্রোদয়১০:৪৯
চন্দ্রাস্তরাত্রি ১০:০৬
Contents hide

মনসা পূজা কেন পালন করা হয়?

মনসাদেবী হিন্দুধর্মে নাগদেবী হিসেবে পূজিত হন। বাংলার লোকজ সংস্কৃতিতে তিনি শুধু সাপের দেবী নন; বরং পরিবার, কৃষি, স্বাস্থ্য, সমৃদ্ধি এবং অকাল বিপদ থেকে রক্ষাকারী দেবী হিসেবেও সম্মানিত। বিশেষ করে গ্রামীণ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মনসা পূজার ঐতিহ্য শত শত বছর ধরে চলে আসছে।

শ্রাবণ মাস বর্ষাকালের মধ্যভাগ। এই সময় সাপের উপদ্রব স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ইতিহাসবিদদের মতে, মানুষের নিরাপত্তা ও প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই মনসাদেবীর পূজার প্রচলন ধীরে ধীরে ধর্মীয় আচার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পরবর্তীতে মনসামঙ্গল কাব্যের মাধ্যমে এই পূজার জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়।

শ্রাবণ মাসে মনসা পূজার বিশেষ তাৎপর্য

শ্রাবণ মাসকে হিন্দু ধর্মে অত্যন্ত পবিত্র মাস হিসেবে ধরা হয়। এই মাসে শিবপূজা, নাগপঞ্চমী, মনসা পূজা, বিভিন্ন ব্রত এবং সংক্রান্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার পালিত হয়। বর্ষার কারণে কৃষিকাজের ব্যস্ততার মাঝেও মানুষ দেবীর আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে এই পূজা করে থাকে।

আমার অভিজ্ঞতায় গ্রামবাংলার অনেক পরিবারে মনসা পূজা কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি পারিবারিক মিলনমেলা হিসেবেও পালিত হয়। বাড়ির প্রবীণ সদস্যরা ছোটদের মনসামঙ্গল কাবিনীর গল্প শোনান, নারীরা বিশেষ ব্রত পালন করেন এবং অনেক এলাকায় সারারাত ভক্তিমূলক গানের আয়োজন করা হয়।

২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক তথ্য

মনসা পূজার দিন শুধু তিথিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; নক্ষত্র, যোগ, করণ এবং সূর্য-চন্দ্রের অবস্থানও পূজার সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী এই দিনে ষষ্ঠী তিথি রাত্রি ৮:১০ মিনিট পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এরপর সপ্তমী তিথি শুরু হবে।

  • তিথি: শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী
  • পরবর্তী তিথি: সপ্তমী
  • নক্ষত্র: চিত্রা
  • যোগ: শুভ যোগ
  • করণ: কৌলব, পরে তৈতিল

যারা নির্দিষ্ট মুহূর্তে পূজা করতে চান, তাদের জন্য এই তথ্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত তিথি বিদ্যমান থাকা অবস্থায় পূজা সম্পন্ন করাই শাস্ত্রসম্মত বলে বিবেচিত হয়।

মনসা পূজার দিন শুভ সময় কীভাবে নির্ধারণ করা হয়?

বাংলা পঞ্জিকায় শুধুমাত্র তারিখ নয়, দিনের বিভিন্ন সময়ও আলাদাভাবে উল্লেখ থাকে। যেমন—অমৃতযোগ, বারবেলা, কালবেলা, কুলিকবেলা এবং অন্যান্য শুভ-অশুভ সময়। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো পূজা, দান, যাত্রা বা অন্যান্য শুভ কাজের জন্য উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা।

২০২৬ সালের মনসা পূজার দিন পঞ্জিকা অনুযায়ী একাধিক অমৃতযোগ রয়েছে, যা ধর্মীয় আচার পালনের জন্য শুভ বলে ধরা হয়। আবার বারবেলা ও কালবেলার মতো সময়ে নতুন শুভ কাজ শুরু না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

বারবেলা ও কালবেলা কী?

অনেকেই এই দুটি শব্দ শুনলেও এর অর্থ জানেন না। বারবেলা হলো দিনের এমন একটি সময়, যখন নতুন শুভ কাজ শুরু করা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। একইভাবে কালবেলাও অনেক পঞ্জিকায় অশুভ সময় হিসেবে উল্লেখ থাকে। তবে দৈনন্দিন পূজা, জপ বা ঈশ্বরস্মরণে এসব সময় বাধা নয়। মূলত নতুন উদ্যোগ, যাত্রা বা বিশেষ অনুষ্ঠান শুরু করার ক্ষেত্রেই এগুলো বিবেচনা করা হয়।

মনসা পূজায় কী কী উপকরণ লাগে?

অঞ্চলভেদে উপকরণের কিছু পার্থক্য থাকলেও সাধারণভাবে মনসাদেবীর পূজায় কলা, দুধ, ফলমূল, ফুল, দূর্বা, ধূপ, প্রদীপ, গঙ্গাজল, চন্দন, বিভিন্ন মিষ্টান্ন এবং নাগদেবীর প্রতীক বা মনসাদেবীর প্রতিমা ব্যবহার করা হয়। অনেক পরিবারে মনসামঙ্গল পাঠও এই দিনের অন্যতম প্রধান আচার।

মনসা পূজার নির্ঘণ্ট ও পঞ্জিকা তথ্যের সহজ ব্যাখ্যা

বাংলা পঞ্জিকায় অনেক এমন শব্দ থাকে, যেগুলো সাধারণ পাঠকের কাছে কিছুটা জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু মনসা পূজার মতো ধর্মীয় আচার সঠিক সময়ে সম্পন্ন করতে এই তথ্যগুলোর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। ২০২৬ সালের মনসা পূজার দিনেও তিথি, নক্ষত্র, যোগ, করণ, অমৃতযোগ, বারবেলা, কালবেলা এবং কুলিকবেলার মতো বিভিন্ন সময় উল্লেখ রয়েছে। এগুলোর অর্থ বুঝে পূজা করলে পরিকল্পনা করাও সহজ হয়।

চিত্রা নক্ষত্রের তাৎপর্য

২০২৬ সালের মনসা পূজার দিনে চিত্রা নক্ষত্র বিদ্যমান থাকবে। জ্যোতিষশাস্ত্রে এই নক্ষত্রকে সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য, নির্মাণ এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। তাই অনেক পরিবার এই দিন পূজার পাশাপাশি নতুন ধর্মীয় সংকল্প বা পারিবারিক মঙ্গলকামনার প্রার্থনাও করে থাকেন।

শুভ যোগ কী বোঝায়?

পঞ্জিকায় উল্লিখিত শুভ যোগ এমন একটি সময়কে নির্দেশ করে, যা ধর্মীয় আচার, পূজা, দান এবং জপের জন্য অনুকূল বলে বিবেচিত হয়। অনেক পুরোহিত পূজার মূল অংশটি শুভ যোগের মধ্যেই সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

কৌলব ও তৈতিল করণ

করণ হলো তিথির একটি বিশেষ অংশ। মনসা পূজার দিনে প্রথমে কৌলব করণ এবং পরে তৈতিল করণ বিদ্যমান থাকবে। শাস্ত্রীয় মতে বিভিন্ন করণের ভিন্ন ভিন্ন ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে। তাই যাঁরা শাস্ত্রসম্মত পূজা করেন, তাঁরা করণের সময়ও বিবেচনায় রাখেন।

অমৃতযোগের সময় কেন গুরুত্বপূর্ণ?

অমৃতযোগকে অনেকেই দিনের সবচেয়ে শুভ সময়গুলোর একটি বলে মনে করেন। পঞ্জিকা অনুযায়ী এই সময়ে পূজা, দান, জপ, মন্ত্রপাঠ কিংবা নতুন শুভ কাজ শুরু করা ফলপ্রসূ বলে বিশ্বাস করা হয়।

২০২৬ সালের মনসা পূজার দিনে একাধিক অমৃতযোগের উল্লেখ রয়েছে। ফলে পূজার আয়োজনকারীরা নিজেদের সুবিধামতো শুভ সময় নির্বাচন করতে পারবেন। বিশেষ করে যারা বাড়িতে পূজার ব্যবস্থা করেন, তারা অমৃতযোগের মধ্যে মূল পূজা সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন।

বিষ্ণুপদী সংক্রান্তি ও মন্দাকিনী সংক্রান্তির গুরুত্ব

২০২৬ সালের মনসা পূজার অন্যতম বিশেষ দিক হলো একই সময়ে বিষ্ণুপদী সংক্রান্তি সম্পর্কিত পুণ্যকালও উল্লেখ রয়েছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী সংক্রান্তির সময় স্নান, দান এবং ধর্মীয় অনুশীলনের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বহু ভক্ত এই দিনে পবিত্র নদীতে স্নান করে পরে মনসাদেবীর পূজা সম্পন্ন করেন।

এছাড়া মন্দাকিনী সংক্রান্তি সম্পর্কেও উল্লেখ পাওয়া যায়। বৈদিক জ্যোতিষে সংক্রান্তি মানে সূর্যের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ। এই পরিবর্তনকে আধ্যাত্মিকভাবে নতুন সূচনার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

লুষ্ঠন ষষ্ঠী (লোটন ষষ্ঠী) কী?

মনসা পূজার দিনের সঙ্গে লুষ্ঠন ষষ্ঠী, যা অনেক অঞ্চলে লোটন ষষ্ঠী নামে পরিচিত, পালিত হয়। এটি মূলত সন্তানদের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং পারিবারিক কল্যাণ কামনায় পালন করা একটি প্রাচীন ব্রত।

বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিবাহিত নারীরা এই দিনে বিশেষ নিয়মে ব্রত পালন করেন। ফলমূল, দুধ, মিষ্টান্ন এবং নিরামিষ আহার দিয়ে দেবীর আরাধনা করার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মঙ্গল কামনা করা হয়। অনেক এলাকায় এই ব্রতের সঙ্গে মনসা পূজার আচার একসঙ্গেই সম্পন্ন হয়।

মনসা পূজায় কী কী করা উচিত?

পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট জানা যেমন জরুরি, তেমনি পূজার সঠিক প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞ পুরোহিতদের মতে নিচের বিষয়গুলো অনুসরণ করলে পূজা আরও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা যায়।

  • পূজার আগের দিন পূজাস্থান পরিষ্কার করুন।
  • পূজার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ আগেই সংগ্রহ করুন।
  • ষষ্ঠী তিথি শেষ হওয়ার আগেই মূল পূজা সম্পন্ন করার চেষ্টা করুন।
  • মনসামঙ্গল পাঠ বা দেবীর স্তোত্র পাঠ করলে পূজার মাহাত্ম্য বৃদ্ধি পায়।
  • পূজার শেষে প্রসাদ বিতরণ এবং দান করলে তা শুভ বলে বিবেচিত হয়।

মনসা পূজায় যেসব বিষয় এড়িয়ে চলা ভালো

লোকাচার ও শাস্ত্রীয় প্রথা অনুসারে কিছু বিষয় থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদিও অঞ্চলভেদে নিয়মের কিছু পার্থক্য দেখা যায়, তবুও অধিকাংশ পুরোহিত নিচের বিষয়গুলো মেনে চলতে বলেন।

  • পূজার সময় অকারণে রাগ বা বিবাদে জড়ানো উচিত নয়।
  • অশুচি অবস্থায় পূজায় অংশ না নেওয়াই উত্তম।
  • পূজার নির্ধারিত সময় অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়।
  • প্রসাদ অপচয় না করে সকলের মধ্যে বিতরণ করা উচিত।
  • শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছাড়া শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতার জন্য পূজা করা থেকে বিরত থাকা ভালো।

বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে মনসা পূজার প্রচলনের পার্থক্য

যদিও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ—উভয় স্থানেই মনসাদেবীর পূজা অত্যন্ত জনপ্রিয়, তবুও কিছু আঞ্চলিক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে মাসব্যাপী মনসা পূজা এবং অষ্টনাগ পূজার প্রচলন এখনও অনেক জায়গায় রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে আবার মনসামঙ্গল পাঠ, লোকসংগীত এবং মেলা বেশি দেখা যায়।

এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যই মনসা পূজাকে শুধু একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী কাঞ্চনা শ্রীশ্রী মনসা মন্দির

২০২৬ সালের পঞ্জিকায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক তথ্য উল্লেখ রয়েছে, যা অনেকেই জানেন না। চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার কাঞ্চনা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী মনসা মন্দিরকে ঘিরে প্রতিবছর শ্রাবণ সংক্রান্তিতে বিশাল ধর্মীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মন্দিরের ইতিহাস প্রায় দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।

মন্দিরটিতে সারা বছর নিত্যপূজা চললেও শ্রাবণ মাসের সংক্রান্তি উপলক্ষে বিশেষ পূজা, হোমযজ্ঞ, প্রসাদ বিতরণ এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার ভক্ত এখানে সমবেত হন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং বাংলার ঐতিহ্য ও লোকবিশ্বাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

বাংলাদেশে মাসব্যাপী মনসা পূজার প্রথা

অনেকেই মনে করেন মনসা পূজা শুধুমাত্র একটি নির্দিষ্ট দিনে অনুষ্ঠিত হয়। বাস্তবে বাংলাদেশের বহু অঞ্চলে পুরো শ্রাবণ মাসজুড়েই মনসাদেবীর আরাধনা চলে। বিশেষ করে নদীবেষ্টিত ও গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্বলন, মনসামঙ্গল পাঠ এবং দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ও ফল নিবেদন করার রীতি এখনও প্রচলিত।

পঞ্জিকার তথ্য অনুযায়ী, শ্রাবণ সংক্রান্তির দিনে মাসব্যাপী এই পূজার সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকাতেও একই ধরনের প্রথা দেখা যায়, যদিও অঞ্চলভেদে আচার-অনুষ্ঠানের কিছু পার্থক্য রয়েছে।

অষ্টনাগ পূজার সঙ্গে মনসা পূজার সম্পর্ক

মনসাদেবীকে নাগদেবী হিসেবে পূজা করা হয়। সেই কারণে অনেক স্থানে মনসা পূজার পাশাপাশি অষ্টনাগ পূজাও পালিত হয়। অনন্ত, বাসুকী, তক্ষক, কর্কট, পদ্ম, মহাপদ্ম, শঙ্খ এবং কুলিক—এই আট নাগদেবতার স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

লোকবিশ্বাসে বলা হয়, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা, বিষাক্ত প্রাণীর ভয় থেকে মুক্তি এবং পারিবারিক কল্যাণের জন্য এই পূজার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। যদিও আধুনিক সমাজে এর ব্যাখ্যা অনেকটাই সাংস্কৃতিক, তবুও বাংলার লোকঐতিহ্যে অষ্টনাগ পূজা আজও গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

মনসা পূজার দিনে শুভ কাজের সময়

২০২৬ সালের পঞ্জিকায় মনসা পূজার দিনের জন্য বিভিন্ন শুভ ও অশুভ সময় উল্লেখ রয়েছে। যারা নতুন পূজার আয়োজন, দীক্ষা, দান বা ধর্মীয় অনুষ্ঠান করবেন, তারা সাধারণত এই সময়গুলো অনুসরণ করেন।

  • অমৃতযোগে পূজা ও দানকে বিশেষ শুভ মনে করা হয়।
  • দীক্ষা গ্রহণের জন্য নির্ধারিত শুভ সময় অনুসরণ করা যেতে পারে।
  • বারবেলা ও কালবেলায় নতুন শুভ কাজ শুরু না করাই উত্তম।
  • সন্ধ্যাকালে সত্যনারায়ণ ব্রত পালন করারও উল্লেখ রয়েছে।

মনসা পূজা উপলক্ষে ঘরোয়া পূজার প্রস্তুতি

বর্তমানে অনেকেই বাড়িতেই মনসাদেবীর পূজা করেন। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে খুব সহজেই পারিবারিকভাবে পূজা সম্পন্ন করা যায়।

  1. একদিন আগে পূজার স্থান পরিষ্কার করুন।
  2. মনসাদেবীর ছবি বা প্রতিমা স্থাপন করুন।
  3. ধূপ, প্রদীপ, ফুল, ফল, দুধ, কলা ও মিষ্টি সংগ্রহ করুন।
  4. পঞ্জিকা অনুযায়ী তিথি শেষ হওয়ার আগেই পূজা সম্পন্ন করুন।
  5. মনসামঙ্গল পাঠ অথবা দেবীর স্তোত্র পাঠ করুন।
  6. পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণ করুন।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

মনসা পূজা ২০২৬ কত তারিখ?

২০২৬ সালে মনসা পূজা পালিত হবে ১৮ আগস্ট, মঙ্গলবার। এটি ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ এবং শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি।

১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ ইংরেজি কত তারিখ?

১২ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ইংরেজি তারিখ হলো ১৮ আগস্ট ২০২৬।

মনসা পূজা মঙ্গলবার কেন পড়েছে?

২০২৬ সালের পঞ্জিকা অনুযায়ী শ্রাবণ শুক্ল ষষ্ঠী তিথি মঙ্গলবারে বিদ্যমান থাকায় ওই দিনই মনসা পূজা পালিত হবে।

লোটন ষষ্ঠী কী?

লোটন বা লুষ্ঠন ষষ্ঠী হলো সন্তান ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় পালিত একটি ঐতিহ্যবাহী ব্রত, যা অনেক অঞ্চলে মনসা পূজার দিনেই পালিত হয়।

মনসা পূজায় কোন ফুল ব্যবহার করা হয়?

অঞ্চলভেদে বিভিন্ন ফুল ব্যবহার করা হলেও সাধারণভাবে শাপলা, জবা, গাঁদা এবং অন্যান্য সুগন্ধি ফুল নিবেদন করা হয়।

মনসা পূজায় কী নিবেদন করা হয়?

ফল, দুধ, কলা, মিষ্টি, ধূপ, প্রদীপ, চন্দন, দূর্বা এবং বিভিন্ন মৌসুমি ফল নিবেদন করা হয়।

বাংলাদেশে কোথায় বিখ্যাত মনসা মন্দির রয়েছে?

চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার কাঞ্চনা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শ্রীশ্রী মনসা মন্দির বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত মনসা তীর্থস্থান।

মনসা পূজার মূল উদ্দেশ্য কী?

দেবী মনসার আশীর্বাদ লাভ, পরিবারের মঙ্গল, সাপের ভয় থেকে রক্ষা, সুস্বাস্থ্য এবং সমৃদ্ধি কামনাই এই পূজার প্রধান উদ্দেশ্য।

আরও জেনে নিনঃ ঘানার তান্ত্রিক নানা কোয়াকু বোনসাম ও ২০২৬ বিশ্বকাপ বিতর্ক

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
error: Content is protected !!